নমস্কার অর্থ কী ? সনাতন ধর্মে নমস্কার শব্দটি কিভাবে এলো ?
সনাতন ধর্মে নমস্কার শব্দটি কিভাবে এলো
নমস্কার হচ্ছে বৈদিকযুগ হতে প্রচলিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ব্যবহৃত অভিবাদনসূচক শব্দ। সাধারণত দুই হাত জোড় করে ‘নমস্কার’ শব্দটি উচ্চারণ করা হয়ে থাকে বলে একে অঞ্জলি মুদ্রা বা প্রণামও বলা হয়।
সৃষ্টির আদি হতে মহাভারতের যুগ পর্যন্ত সকলে পরস্পর নমস্তে বলে সম্বোধন করতেন। তার পর যখন থেকে মতামতান্তর এবং অনেক সম্প্রদায়ের (ধর্ম) আবির্ভাব ঘটে,সেই সময় তারা পরস্পর সন্মান প্রদর্শনার্থে পৃথক পৃথক শব্দ স্থির করে নেয় ।
মহাভারতের পূর্বে ভূমণ্ডলে আর্যদের অখণ্ড রাজ্য ছিল ।মানুষ সকলেই ছিল বৈদিক ধর্মাবলম্বী,তারা পরস্পর নমস্তে বলার মাধ্যমেই কুশল আদান প্রদান করত।বর্তমান যুগে মহাঋষি দয়ানন্দ সরস্বতীর কৃপায় মানুষ বৈদিক সিদ্ধান্তকে আবার হৃদয়ঙ্গম করতে লাগল ।আর সেই সঙ্গে সঙ্গে সবাই “নমস্তে” এর ধারা চালু করা আরম্ভ করল ।
নমস্তে বা নমস্কার অর্থ কী
“নমস্তে শব্দের অর্থ কী ?”
নমস্তে অর্থাত্ আমি তোমায় মান্য করি-তোমার সমাদর করি বা তোমায় শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
উত্তর: বেদেই কেন,বাল্মীকীররামায়ণ, মহাভারত, উপনিষদ্ প্রভৃতি সমস্ত গ্রন্থে “নমস্তে” শব্দের মূলের উল্লেখ পাওয়া যায় ।রামায়নের কোথাও ‘জয় রামজী কী’ মহাভারতে কোথাও ‘হরে কৃষ্ণ’ ‘জয় কৃষ্ণজী কী’ উল্লেখ নেই , রাম চন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং নমস্তে ব্যবহার করতেন ;কেননা তাঁরা সকলেই বৈদিক ধর্মালম্বী। বাংলা ভাষায় যাকে বলা হয় নমস্কার।মূলত শব্দটি হল ‘নমস্তে’ যার বাংলা রুপ হল নমস্কার।
‘নম’ শব্দের অর্থ হল নত হওয়া বা শ্রদ্ধা/সম্মান প্রদর্শন করা যার সাথে ‘তে’ ধাতু যুক্ত হয় যার অর্থ তোমাকে অর্থাত্ নমস্তে অর্থ হল তোমার প্রতি রইল শ্রদ্ধা। ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরে এবং প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনে শ্রীকৃষ্ণ,শ্রীরামচন্দ্র সহ বিভিন্ন ব্যক্তিত্ত্বের নমস্কাররত অবস্থায় খচিত নকশা পাওয়া যায়। আপস্তম্ব ও বৌধায়ন সুত্রেও অভিবাদনের নিয়ম হিসেবে নমস্কার দেবার কথা পাওয়া যায়। পবিত্র বেদে অনেকবার ই নমস্তে তথা নমস্কার প্রদানের উল্লেখ পাওয়া যায়। দেখা যাক, এ সম্পর্কে বৈদিক শাস্ত্র কি বলে !
যো দেবো অগ্নৌ যো অপসু যো বিশ্বং ভূবনাবিবেশ য ওষধীষু যো বনস্পতি তস্মৈ দেবায় নমো নমঃ॥(শ্বেতাশ্ব তর উপনিষদ ২-১৭)
অনুবাদঃ যোগ যেমন পরমাত্মার দর্শনের সাধন বা উপায় ,নমস্কারাদিও অনুরূপ বলিয়া তাঁহাকে নমস্কার জানাই।
তিনি কি রুপে? তিনি দেব অর্থাৎ পরমাত্মার প্রকাশভাব। তিনি কোথায়? তিনি আছেন অগ্নিতে, জলে, তৃণ -লতাদিতে, অশ্বাথাদি বৃক্ষে,তিনি এই বিশ্বভুবনে অন্তর্যামীরুপে অণুপ্রবিষ্ট হইয়া আছেন।”
তাই যখন কাউকে নমস্কার জানানো হয় তখন মূলত সর্বজীবে অন্তর্যামীরুপে অবস্থিত পরমাত্মাকেই প্রণতি নিবেদন করা হয়, কোন মনুষ্যদেহকে নয়। সুতরাং, নমস্কার সকলকেই জানানো যায়।
নমস্তে স্ত্বায়তে নমো অস্তু পরায়তে। নমস্তে রুদ্র তিষ্ঠতে আসীনাযোত তে নমঃ।।(অথর্ববেদ ১১.২.১৫)
অনুবাদ-নমস্কার তোমায়(কেননা) আমাদেরকে দেয়া চৈতন্যের জন্য,হে রুদ্র তোমায় নমস্কার কেননা তুমি ই এই বিবেকরুপে আমাদের মাঝে অবস্থান কর!
আরেকটি মন্ত্র কৃষকদের অভিনন্দন জানাতে গিয়ে বলছে-
নমস্তে লাঙ্গলেভ্যো নম… বিরুত্ক্ষেত্রিযনাশন্যপা…
(অথর্ববেদ ২.৮.৪)
অর্থাত্ যারা লাঙ্গল ও চাষের মাধ্যমে জমিতে ফসল ফলান তাদের জানাই নমস্কার। অভিবাদনরুপে নমস্কার প্রদানের উত্কৃষ্ট উদাহরন যজুর্বেদের নিম্নলিখিত মন্ত্রটি-
নমো জ্যেষ্ঠায় চ কনিষ্ঠায় চ নমং পূর্বজায় চাপরজায চ নমো মধ্যমায় চাপগল্ভায় চ নমো জঘন্যায় চ বুধ্ন্যায় চ।।(যজুর্বেদ ১৬.৩২)
অনুবাদ-নমস্কার জ্যেষ্ঠদেরকে,নমস্কার কনিষ্ঠদেরকে,নমস্কার উচ্চবিত্ত,মধ্যবিত্ত,ধনী- গরীব,জ্ঞানী,স্বল্পজ্ঞানী সকলকে! অর্থাত্ এ থেকে আমরা জানতে পারি যে নমস্কার এমন ই এক অনন্য অভিবাদন যাতে ধনী-গরীব,ছোট-বড়,শিক্ষিত- অশিক্ষিত ভেদ নেই।যে কেউ ই এটা যে কাউকে দিতে পারে।
দুইহাত জোড় মূলত অহংকার ত্যাগ পূর্বক বিনয়ভাব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়।
সংস্কৃতিভেদে করজোড়ে কিছুটা বৈচিত্র্য দেখা যায় যেমন দেবতাদের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতে সাধকরা মাথার উপরে দু’হাত জোড় করে থাকে আবার কোন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতে নমস্কার জানাতে বুকের বরাবর হাত জোড় করা একই সাথে পরমাত্মাকে প্রণতি ও আয়ুষ্মান (দীর্ঘায়ু কামনা) -কে নির্দেশ করে।
নমস্কারের উপকারিতা
২০০২ সালের জুন মাসে প্রকাশিত ইন্ট্যারন্যশনাল ইয়োগা সোসাইটির ম্যগাজিনে বলা হয় যে তারা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে নমস্কার ভঙ্গীতে অর্থাত্ অঞ্জলি মুদ্রায় প্রানায়াম বা ধ্যন করলে তা হাতের মাংসপেশীকে শিথিল করে এবং এটি মাংসপেশীজনিত ব্যথা নিরাময়ে উপকারী। করজোড়ে নমস্কার করার সময় হাত ও বাহুর পেশীগুলি সক্রিয় হয়, যা রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি নমস্কার অর্থ কী ? সনাতন ধর্মে নমস্কার শব্দটি কিভাবে এলো ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়েছেন।
নমস্কার🙏🏻
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি ৷৷
%20(11).jpg)